জীবনসঙ্গী কি ম্যান-চাইল্ড? কীভাবে মানিয়ে চলবেন?
জিনাত শারমিন
পেশায় নিপা (ছদ্মনাম) সেবিকা, বিয়ে হয়েছে ছয় মাসও হয়নি। এর ভেতরেই সে হাঁপিয়ে উঠেছে। জীবনসঙ্গী সাজ্জাদ (ছদ্মনাম) প্রতিদিনই বাইরে বিরিয়ানি বা তেহারি কিছু একটা খাবেই। বাসার রান্না নাকি ভালো লাগে না (তাহলে নিজে রান্না করুক, তা-ও করবে না)। চাকরিতে দুই দিন যাবে, তো তিন দিন যাবে না। এসব করপোরেট চাকরি নাকি তাঁর জন্য না (তাহলে আয়ের জন্য পছন্দের কিছু করুক, সেটাও করবে না)। যা ইচ্ছা তা-ই করবে! অল্পতেই রাগ হয়ে যায়। কিসে যে রাগ হয়, বোঝা মুশকিল! স্ত্রীর টাকায় ঘুরে বেড়াবে, দুই হাতে যা মন চায় কিনবে, আবার সুযোগ পেলেই নিপার চাকরিতে বাগড়া। হাসপাতালে গেলেই ফোন, ‘আজ কখন ফিরবে? তাড়াতাড়ি বাড়ি আসো। কেন নাইট ডিউটি করতে হবে? অন্যরা করুক, তোমার করার দরকার নেই।’ আত্মীয়স্বজনের অনেকেই বলতে শুরু করেছে, ‘ছেলেটা কেবল গায়ে-গতরেই বড় হয়েছে! বুদ্ধিতে এখনো বাচ্চাই রয়ে গেছে।’
আপনার জীবনসঙ্গীর সঙ্গে কি ওপরের কোনো একটা লক্ষণ মিলে যায়? নিজের আবেগ-অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা, টাকাপয়সা হিসাব করে খরচ করতে না পারা, চাপ সামলে চলতে না পারা, সমালোচনা নিতে না পারা, অবুঝ। এককথায় বয়সের সঙ্গে পরিণত আচরণ না করার এসব লক্ষণ মানে তিনি—ম্যান-চাইল্ড। অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক হলেও আচরণ শিশুদের মতো। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের সমাজে বসবাসকারী পুরুষদের মধ্যে অনেকেই ‘ম্যান-চাইল্ড’। বাবা-মায়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিচ্ছেদ, অস্বাভাবিক ছেলেবেলা, কোনো ঘটনার ট্রমা, অতিরিক্ত আহ্লাদে বড় হওয়া, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা না নেওয়া—এ রকম নানা কারণ এ জন্য দায়ী।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন পুরুষের মানসিক পরিপক্বতার বিকাশ যেভাবে হওয়ার কথা, সেটা বাধাগ্রস্ত হয়। কীভাবে? জানতে চাইলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহমেদ হেলাল বলেন, ‘বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকভাবে শত শত বছর ধরে ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। ছেলেশিশুরা খাবার, খেলাধুলা, আচরণ সবখানেই বেশি সুবিধা পেয়েছে। শাসন করা হয়নি। ফলে তাদের ভেতরে সবকিছুই ফর গ্রান্টেড হিসেবে নেওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে নিজেদের সমালোচনা তারা নিতে পারে না। যা মন চায়, তাই করাকে যুক্তিযুক্ত মনে করে। অন্যদিকে কন্যাশিশুদের ভেতর বিরূপ পরিস্থিতিতে টিকে থাকার একটা মানসিকতা তৈরি হয়। ফলে সব পরিবেশেই তারা সহজে মানিয়ে নিতে পারে। এমনকি দুর্যোগেও তাদের টিকে থাকার প্রবণতা বেশি।’ যদিও এই মনোরোগ চিকিৎসক জোর দিয়ে বলেন, বাবা-মায়েরা যখন একজন আরেকজনকে ছোট করে কথা বলে, শিশুমনে সেটা যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া আর দ্বিধার সৃষ্টি করে, সেখান থেকে পরে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও আবেগপ্রবণ বৃদ্ধি’ ভালোভাবে হয় না। ফলে তার ভেতরে ম্যান-চাইল্ড আচরণ দেখা যেতে পারে।