২০২৬ সালের বিশ্ব ১৯৪৫ সালের বিশ্বের মতো নেই!

১৯৪৫ সালে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, আজ তা আর তাদের স্বার্থ পূরণ করছে না। প্রায় আট দশক ধরে এই আন্তর্জাতিক কাঠামো টিকিয়...

১৯৪৫ সালে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, আজ তা আর তাদের স্বার্থ পূরণ করছে না। প্রায় আট দশক ধরে এই আন্তর্জাতিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সামরিক শক্তি ব্যয় করেছে। এই শক্তি কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু সেই অঙ্গীকারের পরিসর ছিল বিস্ময়কর। আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি করতে যুক্তরাষ্ট্রকে কেউ বাধ্য করেনি। তারা নিজেই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্ব ১৯৪৫ সালের বিশ্বের মতো নেই। ইউরোপ পুনর্গঠিত হয়েছে। চীন একটি বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উপসাগরীয় অনেক দেশ এখন ধনী রাষ্ট্র। ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, ভারত, ভিয়েতনামসহ আরও অনেক দেশ দ্রুত উত্থান ঘটাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আজকের বিশ্ব যে হুমকির মুখোমুখি, জাতিসংঘ সনদ রচনার সময় সেগুলোর অনেকটাই কল্পনার বাইরে ছিল। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি উদার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পিছু হটার বদলে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সেই সিদ্ধান্তই আমাদের পাওয়া পৃথিবীকে গড়ে দিয়েছে। তবে এখানেই মূল প্রশ্ন উঠে আসে বাকি বিশ্ব কী করতে চায়? দীর্ঘদিন ধরে বহুপক্ষীয়তা যেন এমন একটি ব্যবস্থা ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছে আর অন্যরা ব্যবহার করেছে। ইউরোপের অনেক দেশ মার্কিন নিরাপত্তা–ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে, আবার একই সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনাও করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবি তুলেছে, কিন্তু অর্থের জন্য নির্ভর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। আর ক্যারিবীয় অঞ্চলের মতো ছোট দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে, কিন্তু তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে সামান্যই। যদি সত্যিই আমরা এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে মূল্য দিই, তবে এখন সেই মূল্য শুধু কথায় নয়, সম্পদ দিয়েও প্রমাণ করতে হবে। এর একটি শক্তিশালী প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে জাতিসংঘ সদর দপ্তর নিউইয়র্ক থেকে সরিয়ে নেওয়া। বিশ্ব যখন যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক উদ্ধার কর্মসূচির জন্য ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে, তখন জাতিসংঘ সদর দপ্তর সরানোর খরচ জোগাড় করাও অসম্ভব নয়। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতিসংঘের অর্থায়নের নতুন কাঠামো। বর্তমানে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তাদের অবদান আরও বেশি। এই নির্ভরতা ওয়াশিংটনকে অতিরিক্ত প্রভাব দিয়েছে এবং সংস্থাটিকে প্রায়ই মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাছে বন্দী করে তুলেছে। যদি আমরা সত্যিই বহুপক্ষীয়তাকে গুরুত্ব দিই, তবে এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে তাদের স্বার্থের অনুপাতে অবদান রাখতে হবে। বিস্তৃত অর্থায়ন কাঠামো শুধু জাতিসংঘকে টিকিয়ে রাখবে না, বরং বহুদিন ধরে প্রত্যাশিত বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিকীকরণও সম্ভব করবে। যদি জাতিসংঘ নতুনভাবে সংগঠিত হয়, বিস্তৃত অর্থায়নে চলে এবং কোনো একক পৃষ্ঠপোষকের ওপর নির্ভরশীল না থাকে, তাহলে হয়তো এসব সংকটের রাতারাতি সমাধান হবে না। কিন্তু অন্তত সংস্থাটি বেশি বৈধতা নিয়ে কাজ করতে পারবে এবং দ্বিচারিতা কমবে। তখন হয়তো কোনো সদস্যের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বাধা ছাড়াই মানবিক করিডর অনুমোদন করা সম্ভব হবে। জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীলতা নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকা যাবে। যুদ্ধের অভিঘাতে বিপর্যস্ত অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য ঋণমুক্তির সমন্বয় করা যাবে। এমনকি শান্তিরক্ষা মিশনও আর কোনো এক দেশের বাজেট রাজনীতির ওপর নির্ভর করবে না।আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে।