কোপাতেও শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখলো বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা
অতিথি নিউজ ডেস্ক ::
একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এর গৌরব ধরে রাখা অন্য দিকে গত এক যুগেরও অধিক সময় ধরে আনর্জেন্টাইন দলের প্রাণ ভোমরা আন হেল ডি মারিয়ার বিদায়ী ম্যাচ হওয়ায় কোপা আমেরিকার ফাইনাল ঘিরে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ছিলো বাড়তি চাপে। চাপ উৎরে তারা ঠিকই জয় তুলে নিয়ে একসাথে অনেক অর্জন তুলে নিয়েছে। ফলাফল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এর পাশাপাশি এখন সবাই আর্জেনটিনাকে কোপা চ্যাম্পিয়ন বলেও স্মরণ করবে।
পায়ে চোট পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়ে যাওয় লিওনেল মেসিক কেঁদেছেন ডাগআউটে বসেও। খেলা শেষে জয় উদযাপনের সাথে কেঁদেছেন আনন্দেও।
চোট পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে খেলার মাঝখানে মাঠের বাইরে চলে যান মেসি
টেলিভিশনের পর্দায় মেসির কান্নার দৃশ্য দেখতে দেখতেই ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হয়েছে গোলশূন্য অবস্থায়, ম্যাচ গড়িয়েছে অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে বদলি হিসেবে নামা লাওতারো মার্তিনেজের ১১২ মিনিটের গোলে কলম্বিয়াকে ১–০ ব্যবধানে হারিয়ে কোপা আমেরিকার রেকর্ড ১৬তম শিরোপা জিতল আর্জেন্টিনা। এর আগে ১৫টি শিরোপা জিতে উরুগুয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কোপা আমেরিকার সর্বোচ্চ শিরোপা জয়ের রেকর্ডে নাম ছিল তাদের।
এর আগে দর্শকদের নজীরবিহীন বিশৃঙ্খলার কারণে প্রায় ১ ঘণ্টা ২২ মিনিট দেরিতে শুরু হয়। বিনা টিকিটে খেলা দেখতে আসা কিছু দর্শক সামলাতে সময় লাগায়ই ম্যাচ শুরু করতে এই দেরি।
টিকিট ছাড়াই উচ্ছৃঙ্খল দর্শকরা ঢুকে পড়েছে মাঠে
দেরিতে শুরু হওয়া ম্যাচে প্রথম আক্রমণটা করেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু এর পর থেকেই ম্যাচে শুরু হয় কলম্বিয়ার আধিপত্য। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার চেয়ে সবদিক থেকেই এগিয়ে ছিল কলম্বিয়া। প্রথমার্ধ শেষে কলম্বিয়ার বলের দখল ছিল ৫৩ শতাংশ, আর্জেন্টিনার ৪৭ শতাংশ। কলম্বিয়া গোলে শট নিয়ে লক্ষ্যে রেখেছে ৪টি, আর্জেন্টিনা ১টি। কলম্বিয়ার মোট পাস ২৫৭টি, আর্জেন্টিনা ২৩২টি। নিখুঁত পাসেও এগিয়ে ছিল কলম্বিয়া ৯০ শতাংশ, আর্জেন্টিনা ৮৭ শতাংশ।
ম্যাচ ১০ মিনিট পেরোনোর পর পজিশন বদলে বাঁ উইংয়ে চলে যান দি মারিয়া। এরপর বাড়ে আর্জেন্টিনার আক্রমণের গতি। দি মারিয়া জায়গা বদলের পর কিছুক্ষণ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার কাছে। সেই সময়ই প্রথমার্ধে লক্ষ্যে রাখতে পারা একমাত্র শটটি নেন মেসি। ১৯ মিনিটে দি মারিয়ার দুর্দান্ত এক নিচু ক্রস থেকে বক্সের মধ্যে বল পান আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। প্রথম স্পর্শটাই ছিল গোলমুখী তীব্র গতির শট। কিন্তু আর্জেন্টিনারই এক খেলোয়াড়ের পায়ে লেগে বলের গতি কমে যায়। কলম্বিয়ার গোলকিপার ভারহাস সহজেই বল গ্লাভসে নেন।
মাঠ ছাড়ার সময় ১৬ বছরের সতীর্থ মেসিকে জড়িয়ে কেঁদেছেন দি মারিয়াও
৪৮ মিনিটে বক্সের বাঁ প্রান্ত থেকে আসা মেসির পাস আরেকজনের পা হয়ে ফাঁকায় এসে বক্সের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তালিয়াফিকো শট নেওয়ার আগেই সেটা কলম্বিয়ার গোলকিপার স্লাইড করে দূরে পাঠান। বল পেয়ে যান দি মারিয়া। তাঁর নেওয়া শট দ্রুত জায়গায় এসে ফিরিয়ে দেন গোলকিপার। ৫৬ মিনিটে দি মারিয়ার ক্রসে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড ঠেকিয়ে কলম্বিয়ার এক খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে ফিরে আসে। সেখান থেকে বল পেয়ে যান মেসি। তিনি আবার বল পাঠান বক্সে। কিন্তু এবার আর বল পাননি আর্জেন্টিনার কেউ। ৫৭ মিনিটে আবার দি মারিয়া বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পাস দেওয়ার ভান করে গোলে শট নেন। সেটি কর্নারের বিনিময়ে কোনোমতে রক্ষা করেন গোলকিপার।
নিজের বিদায়ী ম্যাচে আবেগঘন হয়ে পড়েন ডি মারিয়া
এভাবে আক্রমন-পাল্টা আক্রমনে কোন পক্ষই গোল করতে সমর্থ না হওয়ায় ম্যাচ শেষ পর্যন্ত গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে ৯৪ মিনিটে রদ্রিগো দি পলের ক্রসে শট না নিয়ে ডামি করেন দি মারিয়া। বল পেয়ে যান তাঁর পেছনে থাকা নিকো গঞ্জালেস, গোললাইন থেকে সেটি বাঁচিয়েছেন ভারহাস। ১০১ মিনিটে আবার দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে গোল পায়নি কলম্বিয়া। ১০৭ মিনিটে দি মারিয়ার ক্রসে পা লাগাতে পারলেই গোল পেতেন হুলিয়ান আলভারেজের জায়গায় ৯৭ মিনিটে মাঠে নামা লাওতারো মার্তিনেজ। কিন্তু তিনি তা পারেননি।
১১২ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে রদ্রিগো দি পলের পাস মাঝমাঠে খুঁজে নেয় জিওভান্নি লো সেলসোকে। তিনি বল বাড়ান ডান প্রান্তে বক্সের কাছাকাছি থাকা মার্তিনেজকে। ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়ান ইন্টার মিলানের ফরোয়ার্ড। এ নিয়ে এবারের কোপা আমেরিকায় তাঁর গোল হলো ৫টি। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার উঠছে তাঁরই হাতে।
একমাত্র গোলশেষে লাওতারো মার্তিনেজকে জড়িয়ে ধরে মেসির আনন্দের কান্না
মেসি মাঠ থেকে উঠে যাওয়ার পর ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেতৃত্ব পেয়েছিলেন দি মারিয়া। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার পর তাঁকে তুলে কোচ লিওনেল স্কালোনি মাঠে নামান ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দিকে।
দি মারিয়া মাঠ থেকে নেমে ডাগআউটে গিয়ে কান্নাভেজা চোখে জড়িয়ে ধরেন মেসিকে। মেসিও কাঁদলেন দি মারিয়াকে জড়িয়ে ধরে। ১৬ বছরের সতীর্থকে বিদায় দেওয়ার কষ্টের সঙ্গে মেসির এবারের কান্নায় মিশে ছিল কিছুক্ষণ পরই কোপা আমেরিকার শিরোপা জিততে যাওয়ার আনন্দও।
নিজের বিদায়ী ম্যাচেও প্রাণ ভোমরা ছিলেন দি মারিয়া, খেলেছেনও দারুণ
এই জয়ে একটি ত্রিমুকুটও পেয়ে গেলেন মেসি–দি মারিয়ারা। মহাদেশীয় শিরোপা, বিশ্বকাপ, আবার মহাদেশীয় শিরোপা—স্পেনের পর এই ত্রিমুকুট জেতা দ্বিতীয় দল এখন আর্জেন্টিনা। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার পর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জেতা আর্জেন্টিনা জিতল ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা। স্পেন এই কীর্তি গড়েছিল ২০১০ বিশ্বকাপের আগে ও পরে ইউরোর শিরোপা জিতে। ইউরোর শিরোপা দুটি তারা জিতেছে ২০০৮ ও ২০১২ সালে।