বাজেটের চেনা ছক ও অর্থনীতির সন্ধিক্ষণ: দর্শনের পরিবর্তন কি আসবে?
একটি বাজেট বিদায় নিচ্ছে, আরেকটি নতুন বাজেট দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রতি বছর জুন মাস এলেই আমাদের অর্থনীতিতে এক ধরনের চেনা উদ্দীপনা ও হিসাব-নিকাশের ঝড় ওঠে। কত টাকার বাজ...
একটি বাজেট বিদায় নিচ্ছে, আরেকটি নতুন
বাজেট দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রতি বছর জুন মাস এলেই আমাদের অর্থনীতিতে এক ধরনের চেনা উদ্দীপনা
ও হিসাব-নিকাশের ঝড় ওঠে। কত টাকার বাজেট হলো, ঘাটতি কত, কোন খাতে কর বাড়ল আর কোথায়
কমল—এসব গাণিতিক অঙ্ক
নিয়েই মেতে থাকেন অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। কিন্তু বর্তমান ২০২৬ সালের
এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে অভূতপূর্ব এক সন্ধিক্ষণে এসে উপনীত হয়েছে,
সেখানে শুধু বাজেটের বিশাল অঙ্কের মেলা বসানো আর প্রথাগত ছকে আয়-ব্যয় মেলানো মোটেও
যথেষ্ট নয়। সময় এসেছে বাজেটের ভেতরের অবয়ব বা এর মূল 'দর্শন' পরিবর্তনের। পুরোনো জরাজীর্ণ
কাঠামোকে ধরে রেখে কেবল সংখ্যার ফানুস উড়ালে সংকট কাটবে না; বরং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে
খাপ খাইয়ে নতুন চিন্তার সাহস দেখানোর এটাই উপযুক্ত সময়।আমাদের নীতিনির্ধারকেরা গত এক দশকেরও বেশি
সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট দর্শনের ওপর ভিত্তি করে বাজেট প্রণয়ন করে আসছেন। সেই দর্শনটি
ছিল মূলত ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন’। স্বীকার করতে
হবে, এই দর্শনের সুফল দেশ পেয়েছে। দৃশ্যমান বড় বড় মেগা প্রকল্প আমাদের সক্ষমতার জানান
দিয়েছে। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠটি এখন বড্ড বেশি ধূসর ও রূঢ়। উচ্চ প্রবৃদ্ধির সেই চেনা
দর্শনে যে আজ বড় ধরনের চিড় ধরেছে, তা বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর দিকে তাকালেই
স্পষ্ট হয়ে ওঠে।আজকের প্রধান সংকটগুলো কিন্তু রাতারাতি
তৈরি হয়নি, বরং পুরোনো দর্শনের দুর্বলতার কারণেই এগুলো ডালপালা মেলেছে। টানা কয়েক বছর
ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ডলার সংকট এবং
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপ আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে
নড়বড়ে করে তুলেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আদায় করতে না পারার
দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা। আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত এখনো এই অঞ্চলের অন্যতম সর্বনিম্ন।
কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি তরুণ সমাজকে হতাশ করছে, আর আয়ের চরম বৈষম্য ধনী-দরিদ্রের
ব্যবধানকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে।এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি প্রতি
বছরের মতো এবারও সেই একই দর্শনের পুনরাবৃত্তি দেখব? নাকি কাঠামোগত সংস্কারের কোন সাহসী
পদক্ষেপ দেখতে পাব?বর্তমান অর্থনীতির এই সন্ধিক্ষণে বাজেটের
দর্শন আমূল বদলে ফেলা দরকার। প্রথমত, বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি’র মোহ ত্যাগ করে
‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক
স্থিতিশীলতা’ ফিরিয়ে আনা এবং ‘গুণগত প্রবৃদ্ধি’
নিশ্চিত
করা। প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হলো নাকি ৮ শতাংশ হলো—সেই কাগুজে বিতর্কের চেয়ে বেশি জরুরি সাধারণ
মানুষের দৈনিক খাদ্য তালিকায় পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করা।দ্বিতীয়ত, কর কাঠামোতে বড় ধরনের দর্শনের
পরিবর্তন দরকার। আমাদের দেশে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বেশি। ভ্যাট
ধনী-দরিদ্র সবার ওপর সমানভাবে বর্তায়, যা চরম এক সামাজিক অন্যায্যতার জন্ম দেয়। নতুন
বাজেটের দর্শন হওয়া উচিত ধনীদের ওপর প্রত্যক্ষ করের চাপ বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর
হওয়া, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা কমে।অনেকে বলতে পারেন, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক
ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে রাতারাতি বড় পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব? উত্তর হলো—সম্পূর্ণ নতুন
কাঠামো তৈরি না করেও বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতরেই সাহসিকতার সঙ্গে নতুন সম্ভাবনার পথ
খুঁজে বের করা যায়।আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির দিকে
তাকালে দেখা যায়, প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার অনুৎপাদনশীল প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলিয়ে
রাখা হয়। এখান থেকে বের হয়ে এসে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প নেওয়া বন্ধ করতে হবে। অপচয়
রোধ করার জন্য বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা সম্ভব।রাজস্ব খাতে ডিজিটালাইজেশন বা স্বয়ংক্রিয়
ব্যবস্থার কথা আমরা বহু বছর ধরে শুনছি। কিন্তু এর বাস্তবায়নে এক ধরনের অদৃশ্য আমলাতান্ত্রিক
প্রতিরোধ কাজ করে। এই পুরোনো কাঠামোর দেয়াল ভেঙে যদি সম্পূর্ণ কর ব্যবস্থাকে অনলাইনের
আওতায় আনা যায়, তবে কোন নতুন কর আরোপ না করেই রাজস্ব আদায় দ্বিগুণ করা সম্ভব।পাশাপাশি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দকে
আমরা বরাবরের মতোই অবহেলা করে আসছি। মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া কোন দেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদ
থেকে বের হতে পারে না। কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং জলবায়ু সহনশীল সবুজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ
বাড়ানোর জন্য বিদ্যমান কাঠামোর বাজেট থেকেই বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব। এর জন্য
প্রয়োজন শুধু নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।
বাজেট কোন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক
লাভ-ক্ষতির খতিয়ান নয়। বাজেট হলো একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভাগ্য
পরিবর্তনের এবং সংকটের আবর্ত থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি দূরদর্শী ব্লুপ্রিন্ট। পুরোনো
চিন্তার বৃত্তে বন্দি থেকে নতুন সংকটের সমাধান কখনোই মিলবে না। ২০২৬ সালের এই কঠিন
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা যদি কেবল সংখ্যার
হিসাব না মিলিয়ে, বাজেটের দর্শনে জনকল্যাণ, সমতা এবং সাহসী সংস্কারকে প্রাধান্য দেন,
তবেই এই অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণ আমাদের জন্য সংকটের বদলে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে
দেবে।