কাগজের বাজেট বনাম বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ: সংশয় কাটবে কিসে?
প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর বরাবরের মতোই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সামষ্টিক অর্থনীতির নানা টানাপোড়েন এবং মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও এবারের বাজেটের ভেতর...
প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর বরাবরের মতোই
দেশজুড়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সামষ্টিক অর্থনীতির নানা টানাপোড়েন এবং মূল্যস্ফীতির
চাপের মধ্যেও এবারের বাজেটের ভেতরের পরিকল্পনাগুলোকে সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদরা
বাহ্যিকভাবে ‘জনকল্যাণমুখী’ হিসেবেই দেখছেন।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দের
সদিচ্ছা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বাজেট পেশের পর প্রতি বছরের মতো এবারও
সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি কোটি টাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো—এর বাস্তবায়ন
কি আদৌ সম্ভব? সাধারণ মানুষের মনের এই সংশয় অমূলক নয়। একটি চমৎকার কল্যাণমুখী বাজেটও
কেবল সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে দিনশেষে নিছক কাগজের দলিলে পরিণত হতে পারে। বিশ্লেষকদের
মতে, জনগণের এই সংশয় দূর করে বাজেটকে সফল করতে হলে সরকারকে প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে
বিশেষ নজর দিতে হবে।প্রথমত, কর আদায়ে জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত
করা: যেকোন দেশের বাজেট বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি হলো অভ্যন্তরীণ রাজস্ব। আমাদের
দেশে কর দেওয়ার যোগ্য বিশাল একটি জনগোষ্ঠী এখনো করজালের বাইরে রয়ে গেছে। এর বড় কারণ
কর ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের ভীতি, জটিলতা এবং সচেতনতার অভাব। শুধু আইনের কঠোরতা
বা জোরপূর্বক কর আদায় করে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। সরকারকে কর প্রদানের প্রক্রিয়া
পুরোপুরি হয়রানিমুক্ত এবং ডিজিটাল করতে হবে। সাধারণ মানুষ যখন দেখবে যে তাদের কষ্টের
ট্যাক্সের টাকায় দেশের রাস্তাঘাট, হাসপাতাল তৈরি হচ্ছে এবং সেই টাকার কোনো অপচয় হচ্ছে
না, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কর দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। করদাতাদের জন্য বিশেষ নাগরিক
সুবিধার ব্যবস্থা করা গেলে এই সচেতনতা আরও দ্রুত বাড়বে।দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে লাগাম
টানা: বাজেট বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় গলার কাঁটা হলো দুর্নীতি। প্রতি বছর উন্নয়ন
প্রকল্পের জন্য যে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার একটি বড় অংশ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা,
অনিয়ম ও অপচয়ের কারণে সাধারণ মানুষের কাজে আসে না। সময়মতো প্রকল্প শেষ না করে দফায়
দফায় মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো আমাদের দেশের একটি চিরচেনা রোগ। এই দুর্নীতি বন্ধ করতে না
পারলে জনকল্যাণমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না। এজন্য প্রতিটি
সরকারি কেনাকাটা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কেবল মুখে
নয়, কাজের মাধ্যমে দৃশ্যমান করা এখন সময়ের দাবি।তৃতীয়ত, অর্থ পাচার রোধ ও পাচারকৃত অর্থ
ফেরত আনা: দেশের অর্থনীতি আজ যে ডলার সংকট ও রিজার্ভের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার
অন্যতম প্রধান কারণ হলো লাগামহীন অর্থ পাচার। ওভার-ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং হুন্ডির
মাধ্যমে প্রতি বছর দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই রক্তক্ষরণ
বন্ধ করা না গেলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা
অসম্ভব। সরকারকে অত্যন্ত কঠোরভাবে ব্যাংকিং খাত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তদারকি করতে
হবে। একই সাথে, যেসব অর্থ ইতিমধ্যে পাচার হয়ে গেছে, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া এবং
দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে তা দেশে ফিরিয়ে আনার জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতি এক ধাক্কায় শক্তিশালী অবস্থানে
পৌঁছে যাবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাজেট কেবল কিছু শুষ্ক
সংখ্যার হিসাব-নিকাশ নয়, এটি দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ইশতেহার। সাধারণ মানুষের
মনে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে যে সংশয় রয়েছে, তা দূর করার দায়িত্ব সরকারেরই। কর আদায়ে জনসচেতনতা
বৃদ্ধি, দুর্নীতি উচ্ছেদ এবং অর্থ পাচার রোধ—এই তিনটি ক্ষেত্রে
সরকার যদি দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে পারে, তবে এই কল্যাণমুখী বাজেট বাস্তবায়ন করা
মোটেও কঠিন হবে না। কাগজের বাজেট তখন সত্যি সত্যিই মানুষের জীবনের বাজেটে রূপান্তরিত
হবে।