মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্রহীনতার নেপথ্যে কারণ কি?
অবিসংবাদিতভাবে এ শতকের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু৷ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত...
অবিসংবাদিতভাবে এ শতকের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু৷ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ
হামলায় নিহত হন তিনি৷ লিবিয়ায় গাদ্দাফির মৃত্যু যেমন ছিল মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরতান্ত্রিক
ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে প্রভাবশালী এক উপাদান, সমান সত্য আলী খামেনির ক্ষেত্রেও।
গাদ্দাফি থেকে আলী খামেনির মৃত্যু দুটি ক্ষেত্রেই
পশ্চিমাদের বড় বিজ্ঞাপন ছিল ‘গণতন্ত্র’ ও ‘মানবাধিকার’। বলা হচ্ছে,
খামেনিকে হত্যা এবং ইরানকে শায়েস্তা করার হামলাকে যৌক্তিক করে দেখাতে ইরানের রক্ষণশীল
ব্যবস্থার বিপরীতে গণ-অভিপ্রায়ের বন্দ্যোবস্তের কথা বলছে ওয়াশিংটন। ইরানে রক্ষণশীল শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশটির অভ্যন্তরে জনরোষের খবর
মিথ্যে নয়, বরং নিয়মিতই এর বহি:প্রকাশ দেখা যায়। জনপ্রতিনিত্বের নাম করে ইসলামি বিপ্লবের
পরে সেখানে ‘পলিটিক্যাল ট্রাইবালিজম (রাজনৈতিক গোষ্ঠীতন্ত্র)’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ক্ষেত্রবিশেষে, আলী খামেনিই সকল ক্ষমতার উদগাতা। মতপ্রকাশ, অবাধ চলাফেরা, নারী অধিকারসহ
সামগ্রিক বিচারে ইরানি থিওক্রেসির (ধর্মীয় শাসনতন্ত্র) কুশীলবরা অব্যাহতভাবে অমার্জনীয়
অপরাধ করছেন। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের নানা জায়গায় নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনীকে
পৃষ্ঠপোষকতা দিতে গিয়ে নিজেদের বিপদ বাড়িয়েছেন। ভূরাজনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের
শক্তিমত্তার চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি তৈরি করেছেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। মতাদর্শিক
রাষ্ট্রব্যবস্থার সমস্যা হিসেবে হাজির হওয়া সংকটগুলো জনগণের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি
করছিল। অভ্যন্তরীণ মুদ্রার কল্পনাতীত অবমূল্যায়ন এবং নিত্যদিনের সংকটকে উপেক্ষা করে
বিপ্লবের ধ্বজাধারীরা নিজেদের মতাদর্শিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছিলেন। জনগণের
উপর ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছিলেন কোনো রাখঢাক ছাড়াই। কিন্তু এত কিছু
সত্ত্বেও ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অধিকার কি যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের দায়িত্বের
আওতায় পড়ে? এ নিয়ে মাথাঘামানো পরিষ্কারভাবে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের অনধিকারচর্চা। এ
অনধিকার হস্তক্ষেপের নেপথ্যে ওয়াশিংটনের পরাশক্তিসুলভ মনোভাব। ইতিহাসে বারংবার তারা
স্বীয় স্বার্থে অপরাপর দেশের সার্বভৌম ক্ষমতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ইরানে সত্যিকার
অর্থে পরিবর্তন যদি উপলব্ধ লয়, তবে তা প্রতিপালনের কারিগর হতে পারে ইরানি জনতা। ইরানের
জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের কাছে ইরানি শাসকদের ধর্মীয় কর্তৃত্বের অবলুপ্তি ঘটবেই,
কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দলদাস শাসকদের বসিয়ে ইরানি সম্পদ
লুণ্ঠনের নীলনকশা প্রতিহত করার পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা হটিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল
ব্যবস্থা কায়েম করবে ইরানিরা এবং সেটাই ঘটবে। মার্কিন আগ্রাসনকে বিনাপ্রশ্নে বিরোধিতা
করতে হবে, সেইসঙ্গে ইরানের জনগণের প্রতিরোধ-সংগ্রামকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, গণতন্ত্রের ব্যর্থতা ও পশ্চিমা হস্তক্ষেপকে একাডেমিক
দৃষ্টিভঙ্গিতে সমালোচনা করে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফাওয়াজ৷ তিনি ‘দ্য গ্রেট বিট্রেয়াল:
দ্য স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন দ্য মিডল ইস্ট' বইটি লিখেছেন৷ তাঁর লেখা
এ বইটি প্রকাশিত হয় ২০২৫ সনে৷ এতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের শাসনব্যবস্থা নিয়ে পশ্চিমাদের
কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গিকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তাঁর যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্রহীনতার
নেপথ্যে কোনো সাংস্কৃতিক অযোগ্যতার কারণ নেই। বরঞ্চ ধারাবাহিক দমননীতি, যুদ্ধ এবং বহিঃশক্তির
হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভিনবত্বে আটকে রেখেছে। ইরানের
শাসনব্যবস্থার আজকের পরিণতির কথাকে অস্বীকার করা যাবে? মোটেও না। ইরানে রেজা শাহ পাহলোভির
রাজতন্ত্রকে পরিপুষ্ট করে তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানি তেলসম্পদ লুণ্ঠনের কারবার করেছিল যুক্তরাষ্ট্রই।
সেসময় জনগণ ক্ষোভের বারুদে ফুটছিল। সেই বারুদফোটা আগুনের তপ্তপ্রহরে আবির্ভূত হয়েছে
১৯৭৯ সালের শিয়া ইসলামি বিপ্লব। শুধু ইরান নয়, যুক্তরাষ্ট্র গত শতকের মাঝ থেকে এ পর্যন্ত
বিশ্বসভ্যতার যত জায়গায় যত ক্ষতিসাধন আর বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তাকে মূল্যায়নের বাটখারা
পাওয়াই মুশকিল হবে। মধ্যরাচ্যের বাকি দেশগুলোর গণতন্ত্রহীনতার সংকটেও দায় যুক্তরাষ্ট্রের।
দেশে দেশে স্বৈরাচারী শাসকদের অভয় দিয়ে তাদের মাটিতেই সামরিক ঘাটি তৈরি করার কৌশলগত
অবস্থানে গণতন্ত্রও নেই, মানবাধিকারও নেই। সুতরাং ইরানে দীর্ঘায়িত যুদ্ধের অঙ্ক ধাঁধার
মতো জটিল।