অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশ!
বাংলাদেশের সামনে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। জনসংখ্যাগত সুবিধা, তরুণ শক্তি এবং উন্নয়নের সম্ভাবনা-সবই রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রবৃদ্ধ...
বাংলাদেশের
সামনে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। জনসংখ্যাগত সুবিধা, তরুণ শক্তি এবং উন্নয়নের সম্ভাবনা-সবই
রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রবৃদ্ধিকে অবশ্যই কর্মসংস্থানে
রূপান্তর করতে হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নের বৈচিত্র্য, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা
এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির মধ্য দিয়েই সেই পথ তৈরি হতে পারে। তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত
করা কেবল একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই
উন্নয়নের শর্তও। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নীতিগত সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ যদি সমন্বিতভাবে
কাজ করে, তবে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই পরিণত হবে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে।বিশ্বব্যাংকের
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হলে একটি দেশের জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ
বিনিয়োগ থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি অবস্থান করলেও কর্মসংস্থান
সৃষ্টির জন্য আরও ব্যাপক পরিমাণ ও বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ দরকার। গত এক দশকে দেশের শ্রমবাজারের
অসামঞ্জস্যতার চিত্র তুলে ধরেছে উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক। সম্প্রতি সংস্থাটির দক্ষিণ
এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট ঢাকা সফর করেন। এ সময় তিনি সরকারের উচ্চপদস্থ
ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে বিশ্বব্যাংকের বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো
হয়েছে, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছে। যার বিপরীতে
কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের।বাংলাদেশে
বর্তমানে শিক্ষিত বেকারত্ব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী,
দেশে প্রায় ৯ লাখের কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট বেকার। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের
দক্ষতা বিদ্যমান শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে না। প্রযুক্তি ও কারিগরি
শিক্ষার ঘাটতি। ফলে কর্মক্ষেত্রে এসব গ্র্যাজুয়েট পিছিয়ে রয়েছেন। শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোও
দক্ষ জনশক্তির জন্য বিদেশমুখী হচ্ছে।সম্প্রতি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বিম্বজুড়ে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অস্থিরতা
বিরাজ করছে জ্বালানি তেলের বাজারে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়ার প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বিদ্যমান মৌলিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে দীর্ঘদিনের
অপেক্ষমাণ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।নতুন
শিল্প ও উদ্যোক্তা তৈরির গতি পর্যাপ্ত নয় অর্থনীতিতে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে
সীমিত হারে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গত কয়েকবছরে বাংলাদেশ সেভাবে নতুন শিল্প
ও উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারছে না। ফলে অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎসের দিকেই অনেকেই ঝুঁকে পড়ছে।
বাংলাদেশের
বেকারত্ব সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, দক্ষতা উন্নয়ন,
উদ্যোক্তা সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবন, আঞ্চলিক শিল্পায়ন। বাংলাদেশ এক নিদারুণ অর্থনৈতিক
বাস্তবতার মুখোমুখি বর্তমানে। একদিকে প্রবৃদ্ধির আশাবাদী পরিসংখ্যান, উন্নয়নের সূচকগুলো
ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী; অন্যদিকে দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও কর্মসংস্থানের
নিশ্চয়তা খুঁজছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের
জন্য পর্যাপ্ত ক্ষেত্র সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে উন্নয়নের সাফল্যের গল্পের আড়ালে আরেকটি
বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—চাকরির সংকট। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের
অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, সেই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান
তৈরি করছে তা নিয়ে। কারণ বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে যদি
কর্মসংস্থান বিস্তৃত না হয়, তাহলে জনসংখ্যাগত যে সম্ভাবনাকে আমরা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড
বলছি, সেটি-ই একসময় অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।