শান্তির প্রেসিডেন্ট হতে চাওয়া ট্রাম্প চিরকালীন যুদ্ধের পথেই ফিরেছেন!

ডোনাল্ড ট্রাম্প'র ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন গড়েই উঠেছিল বিদেশে হস্তক্ষেপবিরোধী মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে নিজেকে এম...

ডোনাল্ড ট্রাম্প'র ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন গড়েই উঠেছিল বিদেশে হস্তক্ষেপবিরোধী মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে নিজেকে এমন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন যে তিনি বুশের শুরু করা আফগানিস্তান, ইরাক ও অন্যান্য স্থানের ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ থামাবেন।ইরানে শাসক পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত এ যুদ্ধে ট্রাম্পকে যুক্ত করতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহু ডিসেম্বরের শেষের দিকে যখন মার–এ–লাগোতে ট্রাম্পের কাছে গিয়েছিলেন, তখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে আরও বেশি করে ইসরায়েলি হামলা চালানোর অনুমতি চান। ট্রাম্প তাতে সমর্থন দেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই সমর্থনের পরিসর বেড়ে তা ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের জন্য একটি যৌথ হামলার প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়। মাদুরোকে তুলে নেওয়ার অভিযান সফল হওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পের সামরিক আকাঙ্ক্ষা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। অর্থনৈতিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে ইরানে যখন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, ট্রাম্প তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন যে ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে চড়া মূল্য দিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘সহায়তা আসছে। তখনো ট্রাম্প আসলে এমন প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পূরণ করার অবস্থায় ছিলেন না। ওই সময় ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরি ছিল না, সেখানে যুদ্ধবিমানের সংখ্যা সীমিত ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা প্রায় ৪০ হাজার সেনা যেসব ঘাঁটিতে রয়েছে, সেগুলোও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মতো অবস্থায় ছিল না।অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে বিদেশে সামরিক অভিযান চালানো হলেও তা শুধু পারমাণবিক বা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। তবে এটাই ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল ঝুঁকি হিসেবে থেকে গেল। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্পকে একাধিকবার ফোন করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছেন। যদিও তিনি প্রকাশ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে ছিলেন। ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেন। তখন ইরানে শাসনগোষ্ঠীর পরিবর্তনের ধারণাটি সবচেয়ে জুতসই বিকল্প হয়ে উঠল। ইতিমধ্যে কিছু সপ্তাহ ধরে যৌথ পরিকল্পনা চলছিল। দ্বিতীয় মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে পৌঁছার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরও কিছু সময় লাগল।ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করতেন যে তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি–সংক্রান্ত হুমকির কূটনৈতিক সমাধান চাইছেন। যদিও ট্রাম্প বলছিলেন যে সেই হুমকি তিনি আগে ‘শেষ’ করে ফেললেও তা আবার গড়ে উঠেছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় চূড়ান্ত বৈঠকে ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের কর্মকর্তারা তেহরানের নজিরবিহীন ছাড়গুলোর দিকে ইঙ্গিত করেন। যেমন উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দেওয়া। তবে ট্রাম্প চাইছিলেন আরও বেশি কিছু। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত ২৫ ফেব্রুয়ারি হামলা চালানোর কথা ছিল। তবে জেনেভায় পরবর্তী দিনের বৈঠকের জন্য তা স্থগিত করা হয়। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা আরও পেছানো হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রীয় কম্পাউন্ডে থাকবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।ট্রাম্প এই বিশাল হামলাকে ইরানি জনগণের জন্য ৪৭ বছরের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের কথা কমিয়ে এনেছে; কিন্তু ট্রাম্প এখনো যুদ্ধ চালাতে অবিচল। তাঁর দাবি, তাঁর কাছে প্রায় অফুরান অস্ত্রভান্ডার আছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট, চিরকালের যুদ্ধের পথ থেকে সরে এসে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হতে চাওয়া ট্রাম্প আবারও চিরকালীন যুদ্ধের পথেই ফিরেছেন।  যুদ্ধ কখন শুরু হবে, তা কেবল প্রেসিডেন্টই ঠিক করতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা অন্যরাও নির্ধারণ করতে পারবে। বিশেষ করে এখন যুদ্ধ শেষ হওয়া না হওয়ার বিষয়টি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ওপরও নির্ভর করছে।