স্বচ্ছ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব!

সাম্প্রতিক সময়ের ব্যাংক খাতের চিত্রটি কেবল একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি যা আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীল...

সাম্প্রতিক সময়ের ব্যাংক খাতের চিত্রটি কেবল একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি যা আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মূলত তার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সেই ভিত্তিটি এখন মারাত্মকভাবে নড়বড়ে। খেলাপি ঋণের যে পাহাড় আজ আমাদের সামনে দৃশ্যমান, তা রাতারাতি তৈরি হয়নি; বরং এটি ছিল সুপরিকল্পিত লুটপাট আর নীতিমালার শিথিলতার এক দীর্ঘমেয়াদী ফসল। এই সংকটের মূলে রয়েছে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি এবং এক শ্রেণির 'ইচ্ছাকৃত খেলাপি'র দৌরাত্ম্য। ব্যাংকিং খাতে যখন সুশাসনের অভাব দেখা দেয়, তখন ঋণ আর উৎপাদনশীল বিনিয়োগ হিসেবে থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ অর্থ পাচার বা ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটাতে বারবার জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে নগদ তহবিল প্রদান করা হয়েছে, যা নৈতিকভাবে যেমন সমর্থনযোগ্য নয়, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও এটি একটি দুষ্টচক্রের জন্ম দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্ত্বশাসন যখন খর্ব করা হয় এবং নীতি নির্ধারণে যখন রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়, তখন আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অস্থিরতার পেছনে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার বা ডলার সংকটের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। সমান্তরালে আমাদের আরও একটি সংকটের কথা ভাবতে হয়, আর তা হলো ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্বের চরম অভাব। অনেক বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ব্যাংকিং খাতের এই নৈরাজ্য দূর করতে হলে আমাদের সবার আগে ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করা জরুরি। বাংলাদেশের অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং খাত আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে একদিকে রয়েছে বিগত দশকের পুঞ্জীভূত অনিয়মের বোঝা, আর অন্যদিকে রয়েছে এক অনিশ্চিত আগামীর সংস্কারের চ্যালেঞ্জ। আর্থিক খাতের এই ভগ্নদশার মধ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি। আমরা যখন ক্যাশলেস সোসাইটির দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা মজবুত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ ও অনলাইন লেনদেনে জালিয়াতির ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আধুনিক ব্যাংকিং কেবল চকচকে অ্যাপ বা ওয়েবসাইট নয়, এর পেছনে থাকতে হয় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়। আমাদের দেশে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা নিয়ে গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট মহলে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। কেবল জোড়াতালি দিয়ে একটি ভালো ব্যাংকের সাথে খারাপ ব্যাংক মিশিয়ে দিলেই সংকটের সমাধান হবে না, বরং এর ফলে ভালো ব্যাংকটিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সমন্বয় আনতে হবে। আমাদের প্রয়োজন একটি স্বাধীন এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।  ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ অর্থনীতি রেখে যেতে হলে ব্যাংকিং খাতের এই ক্ষত নিরাময় করা অপরিহার্য। সংকটের গভীরতা অনুযায়ী সমাধানের পথও হতে হবে সুদূরপ্রসারী ও দৃঢ়। একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব।