তেল সূচকে ভঙ্গুর অবস্থানে বাংলাদেশ!

বাংলাদেশ নিজস্ব তেল সম্পদের দিক থেক একেবারেই সমৃদ্ধ নয়, ফলে দেশটি প্রায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪...

বাংলাদেশ নিজস্ব তেল সম্পদের দিক থেক একেবারেই সমৃদ্ধ নয়, ফলে দেশটি প্রায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। এর বড় অংশ ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে; বাস, ট্রাক, নৌযান ও কৃষিযন্ত্র চালাতে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং সেচ ব্যবস্থাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল লাগে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ পড়ে। কারণ আমদানি বিল বেড়ে যায় এবং সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় জ্বালানি সংকটও দেখা দেয়। তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন খরচ ও পণ্যের দামও বাড়ে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হওয়ায় বাংলাদেশ বেশ ভঙ্গুর অবস্থানে আছে তেল সূচকে। তেলের বিশ্বরাজনীতি এখনো উৎপাদক বড় শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও রাশিয়ার হাতে অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক তেল রাজনীতির প্রতিটি পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলে আমাদের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে। ২০২৬ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৫ থেকে ৮৫ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম সাধারণত এর চেয়ে কয়েক ডলার কম থাকে। তবে বিভিন্ন দেশে কর ও ভর্তুকির কারণে খুচরা বাজারে তেলের দাম অনেক ভিন্ন হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি শেষের হামলার পর মাত্র কয়েক দিনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২০ শতাংশ-র বেশি বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, এই পরিস্থিতি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের দিকে যেতে পারে।বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি জ্বালানি তেল। পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের বহু ক্ষেত্রে তেলের ব্যবহার অপরিহার্য। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তেলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল সমীকরণ। বর্তমান পরিস্থিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম, উৎপাদন এবং চাহিদার ভিত্তিতে কয়েকটি দেশ এগিয়ে আছে, আবার কিছু দেশ নানা কারণে চাপে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানী তেলের সংকটের খবর শোনা মাত্রই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আসলে তেল কোথায় কোথায় লাগে, সেটা বোঝা গেলে সংকটের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। জ্বালানী তেলের ব্যবহার মূলত পাঁচটি বড় খাতে ভাগ করা যায়: বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার হয় পরিবহন খাতে। গাড়ি, ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, জাহাজ ও বিমান চালাতে তেল ব্যবহৃত হয়। তাই তেলের দাম বা সরবরাহে সমস্যা হলে যাতায়াত ব্যাহত হয়, পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, এবং পণ্যের দাম বাড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় অনেক দেশে তেল দিয়ে, বিশেষ করে যারা কয়লা বা গ্যাসে নির্ভরশীল নয়। তেলের সংকট হলে বিদ্যুতের দাম বেড়ে যায় এবং সময়মতো সরবরাহ নাও হতে পারে। শিল্প কারখানায় যন্ত্রপাতি চালানো, গরম করা বা শক্তি উৎপাদনের জন্য তেল লাগে। পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে তেল থেকে তৈরি হয় প্লাস্টিক, সিনথেটিক ফাইবার, সার, রং, রাসায়নিক ও বিভিন্ন উপকরণ।কৃষি যন্ত্রপাতি চালাতে তেল ব্যবহার হয়। তেলের দাম বেড়ে গেলে কৃষিকাজের খরচও বেড়ে যায়, যা খাদ্য উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। তেল থেকে তৈরি হয় গৃহস্থালি জ্বালানি, লুব্রিক্যান্ট, ক্যান্ডেল, গ্যাসোলিন-জাতীয় কিছু উপকরণ। অনেক দেশে রান্না ও গরম পানি সরবরাহেও তেলের ওপর নির্ভরতা থাকে।  তেলের বিশ্ববাজার এখনো যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও রাশিয়ার মতো উৎপাদক দেশ এবং চীন ও ভারতের মতো ভোক্তা দেশের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। দাম, চাহিদা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে তেলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সমীকরণ প্রতিনিয়ত নতুন রূপ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরুতে তেলের সরবরাহ নিয়ে পরিস্থিতি ক্রমবর্ধমান সংকটজনক হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার পর তেল ট্যাংকারগুলোর চলাচলও বিঘ্নিত হয়। এতে ইরান ও হরমুজ প্রণালির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল দেশগুলো যেমন বাংলাদেশ, ভারত ও চীন সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে। বর্তমানে উৎপাদন, দাম, চাহিদা এবং বাণিজ্যের দিক থেকে কয়েকটি দেশ বিশ্ব তেলবাজারে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে।