ত্রিশ বছর পর সালমান শাহ: ফুরিয়ে না যাওয়া এক রূপালি উন্মাদনা
মোঃ হাসান আল শাহাজাদানব্বই দশকের শুরুতে যখন বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র ফর্মুলা-নির্ভরতা আর একঘেয়েমিতে বুঁদ হয়েছিল, ঠিক তখনই ধূমকেতুর মতো এক তরুণের আগমন ঘটে।...
মোঃ হাসান আল শাহাজাদানব্বই দশকের শুরুতে যখন
বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র ফর্মুলা-নির্ভরতা আর একঘেয়েমিতে বুঁদ হয়েছিল, ঠিক তখনই
ধূমকেতুর মতো এক তরুণের আগমন ঘটে। মাথায় রূমাল, কানে দুল, চোখে সানগ্লাস আর ঠোঁটে চিলতে
হাসি নিয়ে তিনি এক ঝটকায় বদলে দিয়েছিলেন ঢাকাই সিনেমার চিরচেনা চালচিত্র। তিনি আর কেউ
নন—সালমান শাহ। ৬ সেপ্টেম্বর,
ক্ষণজন্মা এই মহানায়কের ৩০তম প্রয়াণ দিবস। তিন দশক পার হয়ে গেলেও রূপালি জগতের আকাশে
তাঁর জনপ্রিয়তার দ্যুতি একটুও ম্লান হয়নি, বরং সময়ের সাথে সাথে তাঁর অভাব আরও বেশি
প্রকট হয়ে উঠেছে।১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান
সোহানের ‘কেয়ামত
থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায়
অভিষেক ঘটে তাঁর। প্রথম অভিনয়েই তিনি জয় করে নেন কোটি দর্শকের হৃদয়। এরপর মাত্র চার
বছরের সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারে অভিনয় করেছেন ২৭টি চলচ্চিত্রে, যার প্রায় প্রতিটিই ছিল
ব্যবসায়িক ও শৈল্পিক দিক থেকে সফল। ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখী’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘আনন্দ অশ্রু’এমন অসংখ্য সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি নিজেকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।
পর্দায় মৌসুমী ও শাবনূরের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল এদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা রোমান্টিক
রসায়ন, যা আজও ভালোবাসার আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।সালমান শাহ কেবল একজন শক্তিমান
অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ঢালিউডের প্রথম আধুনিক ও প্রকৃত ‘ফ্যাশন আইকন’। তাঁর পোশাকের স্টাইল,
চুলের কাটিং, হেডব্যান্ডের ব্যবহার ও বাচনভঙ্গি সে সময়ের তরুণ প্রজন্মকে গভীরভাবে আন্দোলিত
করেছিল। নব্বই দশকে তাঁর হাত ধরেই নায়কদের সনাতনী রূপ ভেঙে আধুনিকতা ও স্মার্টনেসের
ছোঁয়া লাগে। আজ পর্যন্ত কোন তারকা রুচিবোধের এই আধুনিকতায় তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি।
বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরাও এখনও এই রূপালি রাজকুমারকে নিজেদের প্রধান অনুপ্রেরণা
এবং টেক্সটবুক মনে করেন।১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর,
মাত্র ২৫ বছর বয়সে কোটি ভক্তকে স্তব্ধ করে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। তাঁর এই
অকাল ও রহস্যজনক বিদায় ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনে। এই মহাতারকার
প্রস্থানের পর দেশীয় সিনেমা যে গভীর নেতৃত্ব ও বাণিজ্যিক শূন্যতায় পড়েছিল, তিন দশকেও
তা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। গুণী মানুষের মূল্যায়ন এবং ভালো চিত্রনাট্যের
সংকটে সিনেমা শিল্পের যে অধঃপতন পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, তা সালমান যুগে ভাবাই যেত
না।মৃত্যু মানুষকে শারীরিকভাবে
দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু কিছু মানুষ কালের সীমানা পেরিয়ে বেঁচে থাকেন নিজেদের কর্মে।
সালমান শাহ তেমনই একজন অবিনশ্বর নক্ষত্র। তিনি চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছেন কালজয়ী
সব কাজ। যতদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র টিকে থাকবে, যতদিন রূপালি পর্দার মোহ থাকবে, ততদিন
তিনি কোটি ভক্তের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন। প্রয়াণ দিবসের এই ক্ষণে এই মহানায়কের স্মৃতির
প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।