যুদ্ধের ঝুঁকির প্রান্তে বাংলাদেশ!
জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এটি কৌশলগত নিরাপত্তার প্রশ্ন। রাষ্ট্রীয়-সামাজিক সংহতি যত শক্তিশালী থাকে, বহি...
জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক
প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এটি কৌশলগত নিরাপত্তার
প্রশ্ন। রাষ্ট্রীয়-সামাজিক সংহতি যত শক্তিশালী থাকে, বহিরাগত প্রভাব তত কম কার্যকর
হয়। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং কার্যকর প্রশাসন রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল বাহ্যিক ভারসাম্য নীতি যথেষ্ট নয়, অভ্যন্তরীণ সংহতিও সমান
গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি সরবরাহশৃঙ্খল,
খাদ্য, জ্বালানি ও শ্রমের প্রশ্ন। একে বলা যেতে পারে ‘স্কিল-সিকিউরিটি’, অর্থাৎ দক্ষতা নিজেই একটি নিরাপত্তাসম্পদ। মধ্যপ্রাচ্যে
সংঘাতূ বাড়লে নির্মাণ খাতে শ্রমের চাহিদা কমতে পারে; আবার খাদ্যনিরাপত্তার চাপে কৃষি
খাতে চাহিদা বাড়তে পারে। দক্ষতার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য না থাকলে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে
তাল মেলাতে না পারলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের
যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের শ্রমবাজারের প্রশ্নও একই নিরাপত্তাকাঠামোর অংশ। কোনো সংঘাত দূরবর্তী
স্থানে শুরু হলেও তা শেষ হতে পারে নিকটবর্তী বাস্তবতায়। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা দেখাচ্ছে বিশ্বরাজনীতিতে আবারও নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা ঐক্যের ভেতরের
টানাপোড়েন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে জটিলতা প্রমাণ করছে, ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিরপেক্ষ
থাকাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে প্রস্তুত থাকাও জরুরি। ইরান যুদ্ধের প্রশ্নটি যদি আমরা
কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংঘাত হিসেবে দেখি, তাহলে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আলাদা ও দূরের
মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি বৃহত্তর শক্তির পুনর্বিন্যাসের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
উত্তেজনা, ইউরোপের দ্বিধা এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে একটি নতুন বৈশ্বিক শক্তির মানচিত্র তৈরি হচ্ছে, যেখানে দক্ষিণ
এশিয়াও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই বাংলাদেশকে বুঝতে হলে ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তা’ ও ‘সীমান্ত ভূরাজনীতি’কে একই ফ্রেমে দেখতে হবে।ইরান যুদ্ধ যদি মধ্যপ্রাচ্যে
শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়, তার প্রভাব শুধু সামরিক থাকবে না; জ্বালানিবাজার, সামুদ্রিক
বাণিজ্যপথ এবং বৃহৎ শক্তির কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে তা প্রতিফলিত হবে। ভারত মহাসাগর ও
বঙ্গোপসাগর বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে
আছে, যেখানে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা ও মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা
একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে। ফলে আমাদের নিরাপত্তা এখন বন্দর ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ,
ট্রেড রুট, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকট সব মিলিয়ে
অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন।এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের
নীতিগত কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালের ‘বার্মা অ্যাক্ট’-এ বাংলাদেশকে
সরাসরি আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা হয়েছে, যা দেখায়, বিষয়টি শুধু মিয়ানমারকেন্দ্রিক
নয়; বরং বৃহত্তর ‘রিজিওনাল সিকিউরিটি আর্কিটেকচার’-এর অংশ। যদি ইরান যুদ্ধ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার
করে, তাহলে এ ধরনের কাঠামো আরও সক্রিয় হতে পারে। এতে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর প্রত্যক্ষ
ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে এবং রোহিঙ্গা সংকটে ইতিমধ্যেই চাপে থাকা বাংলাদেশ তার বাইরে থাকবে
না।আন্তর্জাতিক সম্পর্কের
তত্ত্ব এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। কেনেথ ওয়াল্টজ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ‘অরাজক’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো বড়
শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে টিকে থাকে। ব্যারি বুজানের ‘সিকিউরিটি কমপ্লেক্স’ ধারণা দেখায়, একটি অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকট পারস্পরিকভাবে
জড়িত। দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে এককভাবে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক
নিরাপত্তা জটিলতার অংশ। তাই আমাদের কৌশল হতে পারে কোনো এক
শক্তির সঙ্গে প্রকাশ্য বৈরিতা না বাড়িয়ে বহুপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখা।
বাংলাদেশ যুদ্ধের কেন্দ্র
নয়, কিন্তু ঝুঁকির প্রান্তে আছে। তাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হতে পারে
কৌশলগত সতর্কতা, নীতিগত স্পষ্টতা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ।